◉৪১৯ দুর্ঘটনায় নিহত ৪৩৮ : যাত্রী কল্যাণ সমিতি
◉১৫ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৯৪ : সেভ দ্য রোড
পবিত্র ঈদুল ফিতর উপলক্ষে যাতায়াতে সড়ক-মহাসড়কে ৩৯৯টি দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৩৯৮ জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ১৮টি দুর্ঘটনায় ২৪ জন নিহত ও ২১ জন আহত হয়েছেন। নৌপথে ২টি দুর্ঘটনায় ৭ জন নিহত ও ৫ জন আহত হয়েছেন। সর্বমোট ৪১৯টি দুর্ঘটনায় ৪৩৮ জন নিহত ও ১ হাজার ৪২৪ জন আহত হয়েছেন।
গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী এসব তথ্য তুলে ধরেন। সংগঠনটির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেল প্রতি বছরের মতো এবারও এ নিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতি বছর ঈদ ঘিরে সড়ক দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যাওয়ায় সংগঠনটি ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানির বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করে আসছে।
সংগঠনটির পর্যবেক্ষণ বলছে, এবারের ঈদে লম্বা ছুটি থাকায় লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ শতাংশ মানুষের বেশি যাতায়াত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঈদযাত্রা শুরুর দিন, ৪ এপ্রিল থেকে ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফেরা ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত বিগত ১৫ দিনে ৩৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪০৭ জন নিহত ও ১ হাজার ৩৯৮ জন আহত হয়েছেন। বিগত ২০২৩ সালের ঈদুল ফিতরে ৩০৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩২৮ জন নিহত ও ৫৬৫ জন আহত হয়েছিলেন। বিগত বছরের সঙ্গে তুলনা করলে এবারের ঈদে সড়ক দুর্ঘটনা ৩১.২৫ শতাংশ, প্রাণহানি ২৪.০৮ শতাংশ, আহত ১৪৭.৪৩ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বরাবরের মতো এবারও দুর্ঘটনার শীর্ষে রয়েছে মোটরসাইকেল। এবারের ঈদে ১৯৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৬৫ জন নিহত ও ২৪০ জন আহত হয়েছেন। যা মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৪৯.৬২ শতাংশ, নিহতের ৪০.৫৪ শতাংশ এবং আহতের ৩০.৩৭ শতাংশ। প্রায় এই সময় সড়কে দুর্ঘটনায় আহত ৮৭ জন চালক, ৩১ জন পরিবহন শ্রমিক, ৪০ জন পথচারী, ৭৫ জন নারী, ৪৭ জন শিশু, ২৭ জন শিক্ষার্থী, ৮ জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, ৪ জন শিক্ষক, ১ জন রাজনৈতিক দলের কর্মী, ১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা, ২ জন চিকিৎসকের পরিচয় মিলেছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির সড়ক দুর্ঘটনা মনিটরিং সেলের সদস্যরা বহুল প্রচারিত ও বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় ও আঞ্চলিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের পাশাপাশি জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (পঙ্গু হাসপাতালে) থেকে আহত ৬৫৮ জনের মধ্যে যাচাই-বাছাই করে ৬০৮ জন আহত রোগীর তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করে।
এসব দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মোট যানবাহনের ৪০.৫০ শতাংশ মোটরসাইকেল, ১৪.২৮ শতাংশ ট্রাক, পিকআপ, কাভার্ডভ্যান-লরি, ৬.৫০ শতাংশ কার মাইক্রো-জিপ, ৫.৯৬ শতাংশ নছিমন-করিমন-ট্রাক্টর-লেগুনা-মাহিন্দ্রা, ৬.১৪ শতাংশ অটোরিকশা, ১২.১১ শতাংশ ব্যাটারিচালিত রিকশা-ইজিবাইক-ভ্যান-সাইকেল, ও ১৪.৪৬ শতাংশ বাস দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। দুর্ঘটনার ২৬.৩১ শতাংশ মুখোমুখি সংঘর্ষ, ৪৭.১১ শতাংশ পথচারীকে গাড়ি চাপা দেওয়ার ঘটনা, ২২.৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ার ঘটনা, ০.৫০ শতাংশ ট্রেন-যানবাহনে, ০.৫০ শতাংশ চাকায় ওড়না পেঁচিয়ে ও ৩ শতাংশ অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে দুর্ঘটনা হয়েছে।
এ সময় তিনি মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের আমদানি বন্ধ করে দেশব্যাপী উন্নতমানের আধুনিক বাস নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধ করা, পণ্যবাহী যানবাহনে যাত্রী পরিবহন ঠেকানো, আইন প্রয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতি বন্ধে ডিজিটাল পদ্ধতি প্রয়োগ, চালকের বেতন ও কর্মঘণ্টা সুনির্দিষ্ট করা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য বন্ধ করা, সড়কে চাঁদাবাজি বন্ধে গণপরিবহনগুলোতে নগদ অর্থ বন্ধ করে ডিজিটাল লেনদেন চালুর দাবি জানান তিনি।
ঈদযাত্রার ১৫ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২৯৪ : ঈদযাত্রার ১৫ দিনে সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৪ জনের প্রাণ ঝরেছে। একই সময়ে আহত হয়েছেন ১ হাজার ৮২৭ জন। সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে মোট ১ হাজার ৪৮৮টি। ৫ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত এসব দুর্ঘটনা ঘটে বলে জানিয়েছে গবেষণা ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সেভ দ্য রোড।
গতকাল শনিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানায় সংস্থাটি। তারা দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম পর্যালোচনা, স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বেচ্ছাসেবীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেভ দ্য রোড জানায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রে ট্রাক-বাস ও পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ করে এবার ১৫ দিনে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে যাত্রীবাহী বাসে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সারা দেশে ৫৩২টি বাস দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৬৮৫ জন। নিহত হয়েছেন ১২৫ জন। ফিটনেসবিহীন বাস ও অদক্ষ চালকের কারণে এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। অপরদিকে ২৮৮টি ট্রাক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৭ জন, আর আহত হয়েছেন ৩৪৯ জন। এছাড়া হাইওয়েতে থ্রি-হুইলারসহ অন্যান্য বাহন ও পিকআপের ৪১৭টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৮৪ জন। আর ৫০৩ জন আহত হয়েছেন।
এদিকে ঈদযাত্রার ১৫ দিনে ২৫১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ২৯০ জন আহত এবং নিহত হয়েছেন ২৮ জন। অন্যদিকে ৫ এপ্রিল থেকে ১৯ এপ্রিল- এই ১৫ দিনে রেলপথে ১১ জন আহত হয়েছেন। আর নৌপথে ১৭টি দুর্ঘটনায় ১০ জন নিহত ও ৫২ জন আহত হয়েছেন। এবার ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনার মূল কারণ হিসেবে সেভ দ্য রোড চারটি বিষয় উল্লেখ করেছে। এগুলো হলো স্পিডগান, সিসি ক্যামেরা ও রোড ডিভাইডারের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা। নির্ধারিত গতিসীমা না মানার কারণে বিচারের আওতায় না আনা। হাইওয়েতে থ্রি-হুইলার চলার পাশাপাশি কুমিল্লা, ফেনী, বগুড়া, বরিশালসহ বিভিন্ন রুটে ‘ঝাপখোলা’ বিশেষ ধরনের মাইক্রোবাস চলায় দুর্ঘটনা বেশি ঘটেছে।
দুর্ঘটনা রোধে সেভ দ্য রোড কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছে। এগুলো হলো কার্যকর সিসি ক্যামেরা ও পুলিশ বুথ স্থাপন, সারা দেশে ফুটপাত দখলমুক্ত, ফিটনেসবিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং চালক কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস হওয়া।














