ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় খান ইউনিসে ইসরায়েলি এক স্নাইপারের গুলিবিদ্ধ ১৪ বছর বয়সি শিশুকে কবর দিয়েছেন আবু জাওয়াদ কবরগুলো মাটিতে তৈরি করা হয়, তারপর উপরে একটি চিহ্ন দিয়ে দেওয়া হয়, যাতে তাদের মধ্যে সমাহিত ব্যক্তির পরিচয় জানা যায়।
সাদি হাসান সুলাইমান বারাকা, ডাকনাম আবু জাওয়াদ। ৬৪ বছর বয়সি আবু জাওয়াদ পেশায় মুর্দাফরাশ। কয়েক দশক আগে থেকে তিনি মরদেহ দাফনের শেষ কাজগুলো করে আসছেন। আবু জাওয়াদ গাজার মধ্যাঞ্চলে অবস্থিত দেইর-আল-বালাহ শরণার্থী শিবিরের প্রথম দিকের বাসিন্দাদের একজন। সেখানে ছোট একটি বাড়িতে স্ত্রী ও ১০৪ বছর বয়সি মাকে নিয়ে থাকেন। ১০ সন্তানের বাবা ও ১১৬ নাতি-নাতনির দাদা-নানা জাওয়াদকে এখন প্রতিদিন এই কাজে নিরন্তর ব্যস্ত থাকতে হয়। একদিনে এতো মানুষকে দাফন করা যে সম্ভব, তা তিনি আগে কল্পনাও করতে পারেননি। সাদাসিধে, প্রাণবন্ত ও দয়ালু আবু জাওয়াদ দেইর-আল-বালাহর হৃৎস্পন্দন হিসেবে পরিচিত। তার নিরিবিলি জীবনে ছন্দপতনের সুগভীর আঘাত তিনি নিজের মনে আর দেহে প্রতিনিয়ত টের পান।
৬৪ বছর বয়সি আবু জাওয়াদ বলেন, আমার ওজন ৩০ কেজি কমে গেছে। দাফনের পালা শেষ হওয়ার পর আমি রাতে ঘুমাতে পারি না, খেতে পারি না। আমি যেসব দৃশ্য দেখি একেবারে বিভীষিকা। আমার ২৭ বছরের পেশাজীবনে যত দাফন করেছি, তার চেয়ে ১০ গুণ বেশি মানুষকে কবর দিয়েছি এই যুদ্ধের সময়। প্রতিদিনের হিসাবে সবচেয়ে কম ছিল ৩০ জন এবং সবচেয়ে বেশি ছিল ৮০০ জন। গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে এযাবৎ ১৭ হাজারের বেশি মানুষকে কবরে শুইয়েছি আমি। প্রিয়জনের কবর এবং দাফনের অপেক্ষায় থাকা মরদেহ ঘিরে ক্রন্দনরত স্বজনদের ভিড়ে প্রতিদিন কবরস্থান ভরে থাকে। এখন এটাই আমার জীবন। প্রতিদিন সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত, কখনো আরও বেশি সময় ধরে আমি কবরস্থানে কাজ করি। আমি কাফনের কাপড় গোছাই, কবর খুঁড়ি, জানাজা পড়াই, শোক করি ও দাফন করি। খান ইউনিস থেকে বাস্তুচ্যুত চারজন এই কাজে আমাকে সহযোগিতা করেন। এটা আমাদের স্বেচ্ছাশ্রম। আমরা কেবল আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার এবং শহীদদের জন্য ক্ষমা ছাড়া আর কিছুই চাই না। দেইর-আল-বালাহতে দুটি কবরস্থান আছে। এর মধ্যে একটি পরিপূর্ণ হয়ে গেছে। অন্যটিতেও কবরের জায়গা শেষ হয়ে আসছে।
একদিনে ৮০০ দাফন কাজ করা এই মুর্দাফরাশ আরো বলেন, গত বছরের নভেম্বরে সংক্ষিপ্ত যুদ্ধবিরতি শুরুর দিনটিতে ৮০০ জনকে কবর দেওয়ার কথা মনে আছে, তাদের বেশিরভাগই শিশু। আমরা তাদের ছিন্নভিন্ন অবস্থায় পেয়েছিলাম। দেহগুলো একেবারে ঝাঁঝরা হয়ে গিয়েছিল, মনে হয় যেন ইসরায়েলের স্নাইপাররা এই মানুষদের তাদের নিশানা শেখার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন। সাধারণত আমরা কাফনের ওপর মৃত ব্যক্তির নাম লিখে রাখার সুযোগ পাই এবং তাদের প্রিয়জনেরা এসে তাদের জন্য দোয়া করতে পারেন। কিন্তু সেই ৮০০ জনকে দেখতে আসার জন্য কোনো প্রিয়জনও ছিল না। আমার কাছে মনে হয়, যারা মারা গেছেন, তারাই এখনো বেঁচে আছেন, আর আমরা মৃত। কারণ, আমরা ধীরে ধীরে মারা যাচ্ছি। এখানে বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। পানি, খাবার, বিদ্যুৎ, শান্তি-কিছুই আর নেই। এটা কি কোনো জীবন? প্রায় প্রতিদিনই আমি অনেককে দেখি, যারা তাদের প্রিয়জনের কবর ছেড়ে যান না। আমি চলে যাই; ফিরে এসে দেখি, তারা ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছেন।
তিনি আরো বলেন, প্রিয়জনকে কবরস্থানে নিয়ে আসতে পরিবারগুলোর কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ লেগে যায়। কখনো বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মরদেহ বের করার জন্য কোনো হাতিয়ার থাকে না। কখনো মরদেহ মুড়িয়ে আনার মতো কাফন বা কোনোরকম আচ্ছাদন জোটে না। প্রতিদিন যে মাত্রার বিনাশ, ক্ষয়ক্ষতি ও বিভীষিকা দেখি, সেটা সত্ত্বেও আমি (এই কাজ থেকে) বিরত হতে পারি না। কখনো হবও না। এই গণহত্যা বন্ধ করুন! আমরা শান্তিতে বাঁচতে শান্তিপূর্ণ জীবন চাই। আমি প্রতিদিন এখান থেকে বেরিয়ে নিরাপদে বাড়িতে ফিরতে চাই। একই সঙ্গে ক্ষুধা ও যুদ্ধের সঙ্গে লড়াই করতে চাই না।
গাজায় অনাহারে আরো ২ জনের মৃত্যু, নীরবে মারা যাচ্ছেন অনেকে
ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা ভূখণ্ডে অপুষ্টি, অনাহার আর পানিশূন্যতায় আরো দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। এতে করে অবরুদ্ধ এই ভূখণ্ডটিতে মৃতের সংখ্যা পৌঁছাল ২০ জনে। এক বিবৃতিতে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আশরাফ আল-কুদরা বলেছেন, অপুষ্টি ও পানিশূন্যতার কারণে আল-শিফা হাসপাতালে ১৫ বছর বয়সি এক শিশু এবং উত্তর গাজার কামাল আদওয়ান হাসপাতালে ৭২ বছর বয়সি একজনের মৃত্যু হয়েছে। ঘোষিত এই মৃত্যুর সংখ্যা শুধুমাত্র হাসপাতালে যারা পৌঁছেছেন বা হাসপাতালে যারা মারা গেছেন তাদের মৃত্যুকেই সামনে আনছে। আমরা বিশ্বাস করি, আরো বহু লোক হাসপাতালে না পৌঁছানোর ফলে অনাহারে নীরবেই মারা যাচ্ছেন। উত্তর গাজায় দুর্ভিক্ষ মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে, বিশেষ করে শিশু, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত রোগীদের জন্য। অন্যদিকে হাজার হাজার মানুষ অনাহারে মারা যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন। একইসঙ্গে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবিলম্বে মানবিক ও চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
উল্লেখ্য, গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের নজিরবিহীন আন্তঃসীমান্ত হামলার পর থেকে ইসরায়েল গাজা উপত্যকায় অবিরাম বিমান ও স্থল হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। ইসরায়েলি এই হামলায় হাসপাতাল, স্কুল, শরণার্থী শিবির, মসজিদ, গির্জাসহ হাজার হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়ে গেছে। গাজায় ইসরায়েলের আক্রমণের ফলে এখন পর্যন্ত ৩০ হাজার ৭০০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
















