◉ঢাকার বেশিরভাগ গণপরিবহনই মানহীন লক্কড়-ঝক্কড়
◉চলে না ফ্যান, সিটের অবস্থাও বেহাল
◉যানজট, রোদের তাপ আর ইঞ্জিনের গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা
◉ লক্কড়-ঝক্কড় বাস উচ্ছেদের দাবি যাত্রী কল্যাণ সমিতির
রাজধানী ঢাকায় কর্মজীবী মানুষের যাতায়াতের অন্যতম বাহন গণপরিবহন। অথচ এসব মানুষের নির্বিঘ্ন যাতায়াতের জন্য মানসম্মত যানবাহন নেই বললেই চলে। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলাচল করা যানবাহনগুলোর বেশিরভাগ লক্কর-ঝক্কড় ও নিম্নমানের। হাতেগোনা কিছু বাস শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হলেও বাকিগুলোর অবস্থা খুবই বেহাল। অধিকাংশ বাসের ফ্যান সচল নেই। জানালা দিয়েও ঠিকমতো বাতাস ঢোকে না। সিটগুলোতেও ঠিকমতো বসা যায় না। এতে চলমান তীব্র তাপদাহে এসব গণপরিবহনে যাতায়াতকারীদের ভোগান্তির মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। একদিকে যানজট, অন্যদিকে রোদের তাপ আর ইঞ্জিনের ভ্যাপসা গরমে যাত্রীদের হাঁসফাঁস অবস্থা হচ্ছে। লোকাল বাসগুলোতে গাদাগাদি করে যাত্রী ওঠানো আর বিভিন্ন স্টপেজে দীর্ঘক্ষণ থামিয়ে রাখায় কষ্টের মাত্রাও বাড়ে। জরুরি প্রয়োজনে যাতায়াতকারী নারী, শিশু ও বয়স্করা আরো বেশি বিপাকে পড়ছেন। দীর্ঘদিনের অপেক্ষার পর চালু হওয়া মেট্রেরেলে রাজধানীর একটি অঞ্চলের মানুষ বেশ সুবিধা পেলেও ভোগান্তি নিয়েই চলতে হচ্ছে ব্যাপক সংখ্যক নাগরিককে। দেশের বিভিন্ন এলাকার অধিকাংশ গণপরিবহনেও একই ধরনের অবস্থা বিরাজ করছে।
এদিকে স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি কোম্পানির অধীনে নতুন করে ৫ হাজার উন্নতমানের বাস নামানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সেই সঙ্গে সড়কে শৃঙ্খলা আনতে রাজধানী থেকে লক্কড়-ঝক্কড় বাস উচ্ছেদেরও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী।
তিনি বলেন, অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নোংরা আবর্জনায় ভরপুর পরিবহনগুলোতে প্রতিদিন যাতায়াত করছেন নগরবাসী। যানজটে আটকা পড়ে প্রতিদিন কর্মক্ষম মানুষের লাখো কোটি টাকার শ্রমঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য, সিটিং সার্ভিসের নৈরাজ্য, গণপরিবহনগুলোকে মুড়ির টিন বানিয়ে ইচ্ছা মতো যাত্রী হয়রানি চলছে। ইজ্জত ও মর্যাদা নিয়ে এসব পরিবহনে সাধারণ মানুষ যাতায়াত করতে পারছে না। এমন পরিস্থিতিতে সারা দেশে ছোট ছোট যানবাহনের পরিবর্তে সরকারি ব্যবস্থাপনায় একটি কোম্পানির অধীনে অথবা পিপিপির অধীনে নতুন বাস নামানো জরুরি উল্লেখ করে মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, সরকারের নতুন পরিকল্পনায় সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য দ্রুত লক্কড়-ঝক্কড় বাস উচ্ছেদ করে উন্নত দেশের আদলে স্মার্ট, সাশ্রয়ী ও নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে হবে।
মিরপুর থেকে আগারগাঁও রুটে চলাচল করা বিহঙ্গ পরিবহনের একটি বাসে উঠে দেখা যায়, বাসটিতে কোনো ফ্যান নেই। বাসের সামনের ও পেছনের দিকে দুই জায়গায় ছাদ খোলা। তা দিয়ে ভেতরে তীব্র রোদ এসে পড়ছে যাত্রীদের গায়ে। বাসে যাত্রী কম থাকলেও সবাই অস্বস্তিতে। বাসটির দুজন যাত্রী জানান, বহুকাল ধরেই বিহঙ্গ পরিবহনের এমন দশা। লক্কড়-ঝক্কড় হয়ে চলছে। রাস্তায় চলাচল করতে হয় বলে বাধ্য হয়েই তারা ওঠেন। সরকার বাসগুলোর দিকে নজর দেবেন বলে প্রত্যাশা তাদের।
বিহঙ্গ পরিবহনের বাসটির চালক ও সহকারী জানান, মালিক তাদের বাস দিয়েছেন। প্রতিদিন ভাড়া মারেন। হিসাব বুঝিয়ে দিলে মালিক তাদের পাওনা দেন। বাস মেরামত করার দায়িত্ব মালিকের। মালিক সেটি না করলে বাস যেমন আছে, তাদের তেমনই চালাতে হবে। এদিন তুরাগ, সাভার পরিবহন, ঠিকানা, ইতিহাস, আসমানী, অনাবিল, রাজধানী, অগ্রদূত, আকাশ, ভিক্টর ক্ল্যাসিক, আল-মক্কা ও রবরব পরিবহনের একাধিক বাসে ঘুরেও একই চিত্র দেখা গেছে। রবরব পরিবহনের বাসের যাত্রী রাজধানীর তিতুমীর সরকারি কলেজের স্নাতক তৃতীয় বর্ষের ছাত্র শামসুদ্দিন বলেন, একটা দেশের রাজধানীতে চলাচল করা বাস এত লক্কড়-ঝক্কড় হতে পারে, তা কল্পনাতীত। আমরা সাম্প্রতিক সময়ে নানা ক্ষেত্রে অনেক উন্নতি করছি। অথচ আমাদের নগরবাসীরা কীভাবে চলাচল করছেন, তা নিয়ে সরকারের ভ্রুক্ষেপ নেই।
যাত্রীদের কষ্ট হলেও চালক-হেলপারদের কিছুই করার নেই বলে জানালেন আল-মক্কা পরিবহনের চালক শফিকুল ইসলাম। ১০ ট্যাকা ভাড়া দিয়ে বাসে আর কত সুবিধা নিতে চান- বলে উল্টো প্রশ্ন তোলেন তিনি। ঢাকায় চলাচল করা বাসগুলো মেরামত ও সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য সাধারণ মালিকদের দফায় দফায় চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানান সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক সামদানী খন্দকার। তিনি বলেন, মালিক সমিতির মহাসচিব এনায়েত উল্যাহর সই করা চিঠি অন্তত ২৪-২৫ বার সাধারণ মালিকদের আমরা দিয়েছি। মিটিংগুলোতেও তাগাদা দেওয়া হয়। আমরা মালিকদের বলেছি, বাসগুলো মেরামত করতে হবে। সৌন্দর্য বাড়াতে হবে। যখন মেরামত করা হবে, সৌন্দর্য বাড়বে; তখন কিন্তু যাত্রীরা চলাচলে স্বস্তি পাবেন। সে লক্ষ্যে মালিক সমিতি কাজ করে যাচ্ছে।
মালিক সমিতি দফায় দফায় চিঠি দিলেও বাস মেরামত হয় না কেন, এমন প্রশ্নে সামদানী খন্দকার বলেন, এটি আসলে চলমান প্রক্রিয়া। কিছু বাস মেরামত করা হয়। সেগুলো রোডে নামালে আবার কিছুদিন পর লক্কড়-ঝক্কড় চেহারা হয়ে যায়।














