◉গলছে ঘরে থাকা ওষুধ-কসমেটিক্স, নষ্ট হচ্ছে ফল
◉পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রখর রোদ এড়িয়ে চলার পরামর্শ
আবহাওয়া অধিদপ্তর ঘোষিত তীব্র তাপদাহ সারা দেশে বয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থায় খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছেন না কেউ। কিন্তু এরই মধ্যে যারা জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাচ্ছেন তাদের অনেকেই গরমজনিত রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। এই অবস্থায় প্রখর রোদে বেশিক্ষণ একটানা কাজ না করার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা।
আজ ১২ বৈশাখ। এখন চলছে গ্রীষ্মকাল এবং তীব্র তাপদাহ। আবহাওয়া অধিপ্তরের তথ্যানুযায়ী, এখন সারা দেশের রাজশাহী, পাবনা, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, পটুয়াখালী জেলা সমূহের উপর দিয়ে তীব্র তাপদাহ বয়ে যাচ্ছে। মৌলভীবাজার, রাঙামাটি, চাঁদপুর, বান্দরবান জেলাসহ ঢাকা, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা বিভাগের অবশিষ্টাংশের উপর মৃদু থেকে মাঝারি তাপদাহ বয়ে যাচ্ছে এবং তা বিস্তার লাভ করতে পারে। এমন অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে ঘরে থাকা ওষুধ, কসমেটিক্স। অতি গরমে দ্রুত পেকে যাচ্ছে ফল। এ কারণে ফল কিনতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছেন ক্রেতারা। এমনটিই জানিয়েছেন রাজধানীর সেগুনবাগিচা এলাকার ফলবিক্রেতা আফতাব। তিনি বলেন, এখন ফল কেনার পর গরমে খুব দ্রুত পেকে যাচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে বিক্রি করতে না পারলে পচে যাচ্ছে। এই অবস্থায় ফল বিক্রি করে লাভ কম হচ্ছে।
এমন অতিতাপদাহের মধ্যে নিজেকে সুস্থ রাখতে করণীয় প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, এই পরিস্থিতিতে অযথা, অপ্রয়োজনে কেউ বাইরে যাবে না। বাইরে ঘুরাঘুরি করবে না। পার্কে, রেস্টুরেন্টে, বাইরে অযথা সময় নষ্ট করবে না। একান্ত যাদের বাইরে যেতেই হয় শ্রমিক শ্রেণি, কৃষক, রিকশাওয়ালা শ্রমজীবী মানুষ, তারা অন্তত মাথায় একটা ছাতা ব্যবহার করবে। অথবা মাথায় ক্যাপের মতো মাথল বলে এগুলো ব্যবহার করবে। অর্থাৎ একটানা অনেকক্ষণ রোদে থাকবে না। কিছুক্ষণ রোদে কাজ করবে, আবার ছায়াতে কাজ করবে। সবসময় রোদে থাকলে রোদের সমস্যা হয়ে যায়। একটানা যেন রোদ্রে কাজ না করে সেটা অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে। একটানা যদি রোদ্রে কাজ করে তাহলে শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে ১০৫ ডিগ্রির উপরে চলে যায় তখন ঘাম বন্ধ হয়ে যায়। এতে করে মাথা ব্যথা, মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। আর এটাকেই বলে হিট স্ট্রোক। এই হিট স্ট্রোক থেকে বাঁচার একটাই কায়দা কেউ যেন একটানা রোদে না থাকে। খুব ভালো হয়, যারা বাইরে কাজ করে তারা সকালে বিকালে কাজগুলো করে নিবে আর রোদের সময় কাজ থেকে বিরত থাকবে।
শিশুদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিশেষ করে ছোটশিশু যারা তারা রোদে বাইরে যাবে না। দৌড়াদৌড়ি, লাফালাফি করবে না। এখন অবশ্য স্কুুল বন্ধ আছে। সরকার প্রয়োজনে স্কুল বন্ধ আরো বাড়াতে পারে।
এই গরমের খাবার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তরল জাতীয় খাবার বেশি খাবে। এসময় শরীরে পানিশূন্যতা বেশি হয়। অনেকসময় শরীরে লবণ লাগে তাই লবণমিশ্রিত পানি খাবে। রাস্তায় বিক্রি হওয়া গুড়ের শরবত, আখের শরবত এগুলো যেন না খায়। এগুলো স্বাস্থ্যসম্মত না। এগুলো খোলামেলা খাবার। এগুলো খেলে ডায়রিয়া হতে পারে। তাই সতর্কতা হিসেবে খোলামেলা খাবার যেন না খায়। আর কাপড় পরবে ঢিলেঢালা। খুব উজ্জ্বল রংয়ের পোশাক নয়, সাদা বা হালকা রংয়ের পোশাক পরবে। সুতি কাপড় পরবে, কোনো সিনথেটিক কাপড় পরা যাবে না। আর খাবারের ক্ষেত্রে কোনো গুরুপাচ্য খাবার খাবে না। সহজে হজম হয়, এমন খাবার খেতে হবে। নিজের ঘরে তৈরি করা খাবার খাবে। শাকসবজি, টাটকা খাবার খাবে। নিজের ঘরের তৈরি খাবারও অনেকক্ষণ বাইরে রাখলে নষ্ট হয়ে যায়, এটা একটা বড় সমস্যা। বিশেষ করে যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে শিশু, বয়স্ক, কিডনি রোগী, হৃদরোগী, ক্যান্সারের রোগী, ব্লাড প্রেসারের রোগী, ডায়াবেটিসের রোগী, গর্ভবতী মহিলা তারা আরো বেশি সতর্কতা অবলম্বন করবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, হৃদরোগীদের ক্ষেত্রে যেটা হয়, এই রোগীদের কিছু কিছু ওষুধ আমরা দেই রক্তকে তরল রাখার জন্য। অতিরিক্ত গরমে ঐ ওষুধের প্রভাবে রোগীর ব্লাড সুগার কমে মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারে।
কুমুদিনী উইমেন্স মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের স্ত্রীরোগ ও প্রসূতিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী দৈনিক সবুজ বাংলাকে বলেন, আমাদের প্রচুর পানি পান করতে হবে। অর্থাৎ আমরা সাধারণত বলি একজন মানুষের কমপক্ষে তিন লিটার পানি খাওয়া উচিত।
রোগ প্রতিরোধ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ডা. মো. হারিসুল হক বলেন, গরমজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধের জন্য প্রচুর পরিমাণে পানি খেতে হবে। শীতল যায়গায় থাকার চেষ্টা করতে হবে। সুতির কাপড়, সাদা ও হালকা রংয়ের পরতে হবে। ঘন ঘন পানি খেতে হবে।
অধ্যাপক ডা. বিলকিস বেগম চৌধুরী বলেন, যারা ক্রিকেট খেলে বা কৃষক যারা মাঠে চাষ করে (যদি সম্ভব হয়) তারা ব্যবহার করতে পারে। আর ঘর থেকে রোদে বের হওয়ার সময় স্বাভাবিক নিয়মগুলো (যেমন-ছাতা, রোদচশমা ব্যবহার) মেনে চলব।
ইউনিসেফের সতর্কতা: এদিকে, বাংলাদেশজুড়ে তাপদাহের মধ্যে উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের ইউনিসেফের প্রতিনিধি শেলডন ইয়েট। তিনি এক বিবৃতিতে বলেছেন, ইউনিসেফের ২০২১ সালের শিশুদের জন্য জলবায়ু ঝুঁকি সূচক (সিসিআরআই) অনুযায়ী, বাংলাদেশে শিশুরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ‘অতি উচ্চ ঝুঁকিতে’ রয়েছে। চলমান এ তাপদাহ থেকে শিশু ও অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সুরক্ষার জন্য ইউনিসেফ সম্মুখসারির কর্মী, বাবা-মা, পরিবার, পরিচর্যাকারী ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছে।
প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে শিশুরা যেখানেই থাকুক না কেন তাদের বসা ও খেলার জন্য ঠান্ডা জায়গার ব্যবস্থা করা, তপ্ত দুপুর ও বিকালের কয়েক ঘণ্টা তাদের বাড়ির বাইরে বেরোনো থেকে বিরত রাখা, শিশুরা যেন হালকা ও বাতাস চলাচলের উপযোগী পোশাক পরে, তা নিশ্চিত করা, সেই সঙ্গে সারা দিন তারা যেন প্রচুর পানি পান করে, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে।
প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে যদি কোনো শিশু বা অন্তঃসত্ত্বা নারীর মধ্যে ‘হিট স্ট্রেস’ বা তাপমাত্রাজনিত সমস্যার উপসর্গ দেখা দিলে তাকে ঠান্ডা জায়গায় নিয়ে যেতে হবে। এরপর ভেজা তোয়ালে দিয়ে তার শরীর মুছে দিতে হবে বা গায়ে ঠান্ডা পানি দিতে হবে।
তাপদাহ চলাকালে অসহায় পরিবার, প্রতিবন্ধী শিশু, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও প্রবীণ ব্যক্তিরাই সবার আগে অসুস্থ হয়ে পড়েন, এমনকি মৃত্যুর উচ্চ ঝুঁকিতেও তারাই বেশি থাকেন। তাই তাদের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিতে হবে। প্রতিবেশী, বিশেষ করে যারা একা থাকেন, তাদের খেয়াল রাখতে হবে।














