০৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২০ মে ২০২৬, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সাংবাদিকদেরও একটা রাজনীতি আছে : মাহমুদা চৌধুরী

স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় যেসব নারী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মাহমুদা চৌধুরী। তিনি চল্লিশ বছর ধরে এই পেশায় থেকে পেশাকে সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারে পেরিয়েছেন নানা চড়াই-উৎরাই। তিনি একান্ত আলাপচারিতায় বলেছেন, তার জীবনের না বলা অনেক কথা। তার সাক্ষাতকার নিয়েছেন দৈনিক সবুজ বাংলা’র রিপোর্টার তাসকিনা ইয়াসমিন। আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে তার সাক্ষাতকার ছাপা হচ্ছে। 

পর্ব- ৬

নারীবাদী কমলা ভাসিনের কথায় আমি দেশে ফিরে দিনকাল এ জয়েন করি

আমি দিনকালে জয়েন করলাম। এটা যে একটা রাজনৈতিক দলের পত্রিকা তাতো বোঝাই যায়। আমি ৮৯ সালে একটা জেন্ডারের কোর্স করতে ইনডিয়া গেছিলাম। সেই কোর্স করতে গিয়ে নারীবাদী কমলা ভাসিন দিল্লীতে একটা প্রোগ্রামে বলেছিলেন, মাহমুদা আমি বাংলাদেশে গিয়েছি। তোমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে মেয়েদের নিউজগুলো খুব নেগিটিভ। তোমরা যা লিখ ভীষণ কষ্ট হয়। তোমাদের মেয়ে রিপোর্টার নাই! তুমি দেশে ফিরে চেষ্টা করবে দৈনিকের রিপোর্টিং করতে। তখন আমি তার কথাগুলো শুনলাম। সত্যি তো! কারণ আমি এমন সব নিউজ পড়েছি যেখানে মেয়েদের খুব অসম্মান করা হয়। এমন কি বিজ্ঞাপনের মধ্যেও দেখেছি যে মেয়েদের খুব ডিসক্রিমিনেশন করা হয়। যেহেতু আমি খুব মনোযোগী পাঠক খুব স্বাভাবিকভাবেই এগুলো আমার চোখে পড়ত। আমি কমলা ভাসিনের সঙ্গে কথা বলে বললাম, আমি চেষ্টা করব।

 

আমি খুব চেষ্টা করেছি তুমি জানো, খুব প্রগতিশীল চিন্তার পত্রিকাগুলোতে ঢোকার জন্য। কিন্তু কেউ রিপোর্টার নিবে না। তখন কিন্তু অলরেডি দুজন রিপোর্টার তাদের কাগজে আছে। তখন ছিল হাসিনা আশরাফ দৈনিক বাংলায়, তার হাজব্যান্ড ছিল সেখানে বড় পদে। সেই তাকে বড় পদে এনে বসিয়েছে।

 

সে কোন রিপোর্টিংয়ে যাবেনা। সে প্রেসরিলিজ করবে। অফিসে বসেই সে কাজ করবে। এটা নিয়ে সাংবাদিক মহলে অনেক নেগেটিভ কথাবার্তা বলত। আমি যখন নিজে গিয়ে চিফ রিপোর্টারকে কাজ করতে চাই বললাম, তখন আমাকে বলল, না না আমরা তো আর একটা হাসিনা আশরাফ চাই না। এভাবেই আমাকে বলল। আমি বললাম, কি করেছে হাসিনা আপা?

 

তখন বললেন, উনি তো বাইরে যান না। আর একজন ছিল, সে স্টাফ রিপোর্টার ছিল। সে বাসসে ফিচার লিখত। সে খুব ভাল লিখে। সে রিপোর্টিংয়ের চেয়ে ফিচার বেশি লিখে। আমি যখন বিভিন্ন যায়গায় ঢুঁ মারলাম সব যায়গা থেকে আমাকে ডিসকারেজ করল। বাংলার বাণীর আকতারুজ্জামান আমাকে নিয়ে শেখ সেলিমের কাছে গেছিলেন। উনি বললেন তুমি জব করতে চাও। আমি বললাম, হ্যা। উনি বললেন, ডেস্কে কাজ করতে। এখন আমি কোথায় যাব?
সংবাদে বলে যে ডেস্কে কাজ করো! ডেস্কে মেয়েরা আছে। আমি বললাম যে না বজলু ভাই, আমি কিছুতেই ডেস্কে কাজ করব না। আমার ইচ্ছাই হচ্ছে আমি রিপোর্টিংয়ে কাজ করব। আমি এরপর চুপচাপ বসে আছি।

 

খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা বছরের দুই সেরা চরিত্রের ইন্টারভিউ শাহাদাত চৌধুরীর নির্দেশে আমি করি

১৯৯০ সাল চলে আসল। ৯০’তে গণঅভূত্থান হলো। সরকার বদল হলো। মজার ব্যাপার কি? রহস্যটা দেখ! আমি কি রকম রিপোর্টার ছিলাম দৈনিক বিচিত্রায়। বর্ষপূর্তি বেরুবে। এটা খুবই ইমপরট্যান্ট ব্যাপার হবে। শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে এরশাদের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। প্রত্যেক দিন না হলে সপ্তাহে ২ দিন অন্তত উনারা একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতেন। এরশাদ এবং শাহাদাত চৌধুরী। এত ভাল সম্পর্ক ছিল। অনেক ভাল ভাল প্ল্যান দিয়েছিল। আজকের যে হাতিরঝিল এটার কথা শাহাদাত ভাই বলেছিল। যে এভাবে পানি বেস্টিত করে হাতিরঝিলটা করা যায়। তখন কিন্তু একবার এটা আলোচনা হয়েছিল। পেপারে এসেছিল। এত ক্ষমতাবান ছিল শাহাদাত ভাই সেই সময়ে। প্রত্যেক বছরের সেরা চরিত্র হতো। ঐ বছরের সেরা চরিত্র হিসেবে শাহাদাত ভাই ঠিক করে রেখেছে সেরা চরিত্র হবে এরশাদ।

 

তাদের ধারণা ছিল, এরশাদ ক্ষমতায় থাকবে। এরশাদকে হঠাতে পারবেনা। যেহেতু, তাদের সঙ্গে রিলেশনশিপটা খুব ভাল। আমি এগুলো বলতে ভয় পাই না, কারণ মানুষের সত্যটা জানা উচিত কিন্তু বাই দি বাই জয় হয়ে গেল নারীদের খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মাধ্যমে ২ জন নারী সরকার তলিয়ে দিলেন। একদম সরকার পতন হলো। এখানে আমি নারীর বিজয়ের কথা বলব। ঐ প্রথমবারের মতো তারা দুজন একত্র হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টি এবং সেই সময় জামাত ওদের সঙ্গে ছিল। সবাই একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। এটা গণতন্ত্রের বিশাল জয় ছিল। সেই সময় কিন্তু পাশার দান উল্টে গেল। তখন শাহাদাত ভাইরা বিচলিত হয়ে গেল। বর্ষপূর্তি ডিসেম্বর মাসে ৩০ ডিসেম্বর পতন ঘটল। বর্ষপূর্তি তো ৩১ ডিসেম্বরে বেরিয়ে যাবে। সমস্ত কম্পোজ হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র বাকি আছে বছরের সেরা চরিত্র। রাতারাতি সবকিছু বদলে গেছে।

 

আমাকে শাহাদাত চৌধুরী বলছে কি মাহমুদা, আমরা বছরের সেরা চরিত্র নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম তো! আপনি কি সেরা চরিত্র বেগম জিয়া এবং শেখ হাসিনা এদের ইন্টারভিউ নিতে পারবেন? আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার মনে হলো যে, আমি পারব। কারণ কি? আমার হাজব্যান্ড ছিলেন রোটারিয়ান। রোটারিয়ান ক্লাবের যিনি প্রতিষ্ঠাতা উনি জিয়াউর রহমানের আমলে মন্ত্রী ছিলেন। ড. আবেদীন। আর শেখ হাসিনার ছোট বোন যে শেখ রেহানা তার বড় ভাসুর আবার আমাদের রোটারি ক্লাবেরই সেক্রেটারী ছিলেন। তো, সেই হিসেবে আমার হাজব্যান্ড রোটারি করত এবং তাদেরও সঙ্গে খুব ঘনিষ্ট ছিল। তো, আমি আমার হাজব্যান্ডকে এসে ধরলাম যে এপয়নমেন্ট করিয়ে দাও। আমার হাজব্যান্ড ধরলেন আবেদীন ভাইকে। উনি বললেন আরে এটা কোন সমস্যাই না। একরাত্রের মধ্যে ফোন করে টাইম ফিক্সড করে ফেললেন। আর শেখ হাসিনারটা রফিক সিদ্দীকি (উনি সম্প্রতি মারা গেছেন) উনি ঠিক করে দিলেন। তার কিছুদিন আগের আর একটা ঘটনা আছে। আর একটা মেয়ে অন্য একটি পত্রিকায় নারী পাতায় কাজ করত। সে এই ইন্টারভিউ করতে চেয়েছিল কিন্তু কেন জানি তাকে দিতে চায়নি। ফরহাদ ভাই, শাহরিয়ার কবির ভাই চেয়েছিল যে তাকে দিয়ে ইন্টারভিউটা করাবে। বেগম জিয়ার রাগ ছিল বিচিত্রার উপর। কিছুতেই ইন্টারভিউ দিবে না। কাজী জায়াদ ছিল প্রধান প্রতিবেদক, মাহমুদ শফিক ছিল স্টাফ রিপোর্টার তাকে দেয়নি। তারপরে আমাকে যখন সম্পাদক বলেছে আমি বলেছি আমি পারব এবং আমি এটা করে দিলাম।

 

দুইজনের এপয়নমেন্ট করে নিয়ে দুই দিনের মধ্যে করে দিলাম। সারারাত জেগে জেগে ইন্টারভিউ লিখেছি। সারাদিন জেগে জেগে লিখেছি। লিখে তারপরে দিলাম। এটাই বছরের সেরা চরিত্র হিসেবে গেল। প্রথম পাতায় বেগম জিয়ার ছবি। শেষ পাতায় শেখ হাসিনার ছবি। দুজনে দুই সেরা চরিত্র হয়ে গেল ঐ বছরের। তারপরও দেখ তারা আমাকে স্টাফ রিপোর্টার করেনি।

 

তারপর ইলেকশন শুরু হলো। আমাকে ইলেকশন কভার করতে হবে আওয়ামীলীগ অফিস। আওয়ামীলীগ অফিসে গিয়ে বসে থাকতাম। শেখ হাসিনার কি নিউজ হলো না হলো তা নিয়ে আসতাম। সারা সপ্তাহে ২ জনের একটিভিটিজ কোথায় কি করল না করল তা আমাকে লিখতে হতো। এত কিছুর পর আমাকে স্টাফ রিপোর্টার করেনি। বিচিত্রায় আজ পর্যন্ত কোন নারী স্টাফ রিপোর্টার হতে পারেনি।

 

এত প্রগতিশীলতার পত্রিকা সেখানে আমার যায়গা হয়নি। আমি কাজ করেছি কিন্তু আমাকে বৈধভাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। আমার নাম যাচ্ছে রিপোর্টিং করে। আর আমার রিপোর্টের সঙ্গে আর একজনের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে সপ্তম ( শেষ) পর্ব

সাংবাদিকদেরও একটা রাজনীতি আছে : মাহমুদা চৌধুরী

আপডেট সময় : ০৭:২৮:২৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ মে ২০২৪
স্বাধীন বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় যেসব নারী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম মাহমুদা চৌধুরী। তিনি চল্লিশ বছর ধরে এই পেশায় থেকে পেশাকে সমৃদ্ধ করেছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা ক্যারিয়ারে পেরিয়েছেন নানা চড়াই-উৎরাই। তিনি একান্ত আলাপচারিতায় বলেছেন, তার জীবনের না বলা অনেক কথা। তার সাক্ষাতকার নিয়েছেন দৈনিক সবুজ বাংলা’র রিপোর্টার তাসকিনা ইয়াসমিন। আজ থেকে ধারাবাহিকভাবে তার সাক্ষাতকার ছাপা হচ্ছে। 

পর্ব- ৬

নারীবাদী কমলা ভাসিনের কথায় আমি দেশে ফিরে দিনকাল এ জয়েন করি

আমি দিনকালে জয়েন করলাম। এটা যে একটা রাজনৈতিক দলের পত্রিকা তাতো বোঝাই যায়। আমি ৮৯ সালে একটা জেন্ডারের কোর্স করতে ইনডিয়া গেছিলাম। সেই কোর্স করতে গিয়ে নারীবাদী কমলা ভাসিন দিল্লীতে একটা প্রোগ্রামে বলেছিলেন, মাহমুদা আমি বাংলাদেশে গিয়েছি। তোমাদের দৈনিক পত্রিকাগুলোতে মেয়েদের নিউজগুলো খুব নেগিটিভ। তোমরা যা লিখ ভীষণ কষ্ট হয়। তোমাদের মেয়ে রিপোর্টার নাই! তুমি দেশে ফিরে চেষ্টা করবে দৈনিকের রিপোর্টিং করতে। তখন আমি তার কথাগুলো শুনলাম। সত্যি তো! কারণ আমি এমন সব নিউজ পড়েছি যেখানে মেয়েদের খুব অসম্মান করা হয়। এমন কি বিজ্ঞাপনের মধ্যেও দেখেছি যে মেয়েদের খুব ডিসক্রিমিনেশন করা হয়। যেহেতু আমি খুব মনোযোগী পাঠক খুব স্বাভাবিকভাবেই এগুলো আমার চোখে পড়ত। আমি কমলা ভাসিনের সঙ্গে কথা বলে বললাম, আমি চেষ্টা করব।

 

আমি খুব চেষ্টা করেছি তুমি জানো, খুব প্রগতিশীল চিন্তার পত্রিকাগুলোতে ঢোকার জন্য। কিন্তু কেউ রিপোর্টার নিবে না। তখন কিন্তু অলরেডি দুজন রিপোর্টার তাদের কাগজে আছে। তখন ছিল হাসিনা আশরাফ দৈনিক বাংলায়, তার হাজব্যান্ড ছিল সেখানে বড় পদে। সেই তাকে বড় পদে এনে বসিয়েছে।

 

সে কোন রিপোর্টিংয়ে যাবেনা। সে প্রেসরিলিজ করবে। অফিসে বসেই সে কাজ করবে। এটা নিয়ে সাংবাদিক মহলে অনেক নেগেটিভ কথাবার্তা বলত। আমি যখন নিজে গিয়ে চিফ রিপোর্টারকে কাজ করতে চাই বললাম, তখন আমাকে বলল, না না আমরা তো আর একটা হাসিনা আশরাফ চাই না। এভাবেই আমাকে বলল। আমি বললাম, কি করেছে হাসিনা আপা?

 

তখন বললেন, উনি তো বাইরে যান না। আর একজন ছিল, সে স্টাফ রিপোর্টার ছিল। সে বাসসে ফিচার লিখত। সে খুব ভাল লিখে। সে রিপোর্টিংয়ের চেয়ে ফিচার বেশি লিখে। আমি যখন বিভিন্ন যায়গায় ঢুঁ মারলাম সব যায়গা থেকে আমাকে ডিসকারেজ করল। বাংলার বাণীর আকতারুজ্জামান আমাকে নিয়ে শেখ সেলিমের কাছে গেছিলেন। উনি বললেন তুমি জব করতে চাও। আমি বললাম, হ্যা। উনি বললেন, ডেস্কে কাজ করতে। এখন আমি কোথায় যাব?
সংবাদে বলে যে ডেস্কে কাজ করো! ডেস্কে মেয়েরা আছে। আমি বললাম যে না বজলু ভাই, আমি কিছুতেই ডেস্কে কাজ করব না। আমার ইচ্ছাই হচ্ছে আমি রিপোর্টিংয়ে কাজ করব। আমি এরপর চুপচাপ বসে আছি।

 

খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনা বছরের দুই সেরা চরিত্রের ইন্টারভিউ শাহাদাত চৌধুরীর নির্দেশে আমি করি

১৯৯০ সাল চলে আসল। ৯০’তে গণঅভূত্থান হলো। সরকার বদল হলো। মজার ব্যাপার কি? রহস্যটা দেখ! আমি কি রকম রিপোর্টার ছিলাম দৈনিক বিচিত্রায়। বর্ষপূর্তি বেরুবে। এটা খুবই ইমপরট্যান্ট ব্যাপার হবে। শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে এরশাদের খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। প্রত্যেক দিন না হলে সপ্তাহে ২ দিন অন্তত উনারা একসঙ্গে ব্রেকফাস্ট করতেন। এরশাদ এবং শাহাদাত চৌধুরী। এত ভাল সম্পর্ক ছিল। অনেক ভাল ভাল প্ল্যান দিয়েছিল। আজকের যে হাতিরঝিল এটার কথা শাহাদাত ভাই বলেছিল। যে এভাবে পানি বেস্টিত করে হাতিরঝিলটা করা যায়। তখন কিন্তু একবার এটা আলোচনা হয়েছিল। পেপারে এসেছিল। এত ক্ষমতাবান ছিল শাহাদাত ভাই সেই সময়ে। প্রত্যেক বছরের সেরা চরিত্র হতো। ঐ বছরের সেরা চরিত্র হিসেবে শাহাদাত ভাই ঠিক করে রেখেছে সেরা চরিত্র হবে এরশাদ।

 

তাদের ধারণা ছিল, এরশাদ ক্ষমতায় থাকবে। এরশাদকে হঠাতে পারবেনা। যেহেতু, তাদের সঙ্গে রিলেশনশিপটা খুব ভাল। আমি এগুলো বলতে ভয় পাই না, কারণ মানুষের সত্যটা জানা উচিত কিন্তু বাই দি বাই জয় হয়ে গেল নারীদের খালেদা জিয়া এবং শেখ হাসিনার। আন্দোলনের মাধ্যমে ২ জন নারী সরকার তলিয়ে দিলেন। একদম সরকার পতন হলো। এখানে আমি নারীর বিজয়ের কথা বলব। ঐ প্রথমবারের মতো তারা দুজন একত্র হয়েছিল। কমিউনিস্ট পার্টি এবং সেই সময় জামাত ওদের সঙ্গে ছিল। সবাই একত্রিত হয়ে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটিয়েছিল। এটা গণতন্ত্রের বিশাল জয় ছিল। সেই সময় কিন্তু পাশার দান উল্টে গেল। তখন শাহাদাত ভাইরা বিচলিত হয়ে গেল। বর্ষপূর্তি ডিসেম্বর মাসে ৩০ ডিসেম্বর পতন ঘটল। বর্ষপূর্তি তো ৩১ ডিসেম্বরে বেরিয়ে যাবে। সমস্ত কম্পোজ হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র বাকি আছে বছরের সেরা চরিত্র। রাতারাতি সবকিছু বদলে গেছে।

 

আমাকে শাহাদাত চৌধুরী বলছে কি মাহমুদা, আমরা বছরের সেরা চরিত্র নিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম তো! আপনি কি সেরা চরিত্র বেগম জিয়া এবং শেখ হাসিনা এদের ইন্টারভিউ নিতে পারবেন? আমি একটু চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমার মনে হলো যে, আমি পারব। কারণ কি? আমার হাজব্যান্ড ছিলেন রোটারিয়ান। রোটারিয়ান ক্লাবের যিনি প্রতিষ্ঠাতা উনি জিয়াউর রহমানের আমলে মন্ত্রী ছিলেন। ড. আবেদীন। আর শেখ হাসিনার ছোট বোন যে শেখ রেহানা তার বড় ভাসুর আবার আমাদের রোটারি ক্লাবেরই সেক্রেটারী ছিলেন। তো, সেই হিসেবে আমার হাজব্যান্ড রোটারি করত এবং তাদেরও সঙ্গে খুব ঘনিষ্ট ছিল। তো, আমি আমার হাজব্যান্ডকে এসে ধরলাম যে এপয়নমেন্ট করিয়ে দাও। আমার হাজব্যান্ড ধরলেন আবেদীন ভাইকে। উনি বললেন আরে এটা কোন সমস্যাই না। একরাত্রের মধ্যে ফোন করে টাইম ফিক্সড করে ফেললেন। আর শেখ হাসিনারটা রফিক সিদ্দীকি (উনি সম্প্রতি মারা গেছেন) উনি ঠিক করে দিলেন। তার কিছুদিন আগের আর একটা ঘটনা আছে। আর একটা মেয়ে অন্য একটি পত্রিকায় নারী পাতায় কাজ করত। সে এই ইন্টারভিউ করতে চেয়েছিল কিন্তু কেন জানি তাকে দিতে চায়নি। ফরহাদ ভাই, শাহরিয়ার কবির ভাই চেয়েছিল যে তাকে দিয়ে ইন্টারভিউটা করাবে। বেগম জিয়ার রাগ ছিল বিচিত্রার উপর। কিছুতেই ইন্টারভিউ দিবে না। কাজী জায়াদ ছিল প্রধান প্রতিবেদক, মাহমুদ শফিক ছিল স্টাফ রিপোর্টার তাকে দেয়নি। তারপরে আমাকে যখন সম্পাদক বলেছে আমি বলেছি আমি পারব এবং আমি এটা করে দিলাম।

 

দুইজনের এপয়নমেন্ট করে নিয়ে দুই দিনের মধ্যে করে দিলাম। সারারাত জেগে জেগে ইন্টারভিউ লিখেছি। সারাদিন জেগে জেগে লিখেছি। লিখে তারপরে দিলাম। এটাই বছরের সেরা চরিত্র হিসেবে গেল। প্রথম পাতায় বেগম জিয়ার ছবি। শেষ পাতায় শেখ হাসিনার ছবি। দুজনে দুই সেরা চরিত্র হয়ে গেল ঐ বছরের। তারপরও দেখ তারা আমাকে স্টাফ রিপোর্টার করেনি।

 

তারপর ইলেকশন শুরু হলো। আমাকে ইলেকশন কভার করতে হবে আওয়ামীলীগ অফিস। আওয়ামীলীগ অফিসে গিয়ে বসে থাকতাম। শেখ হাসিনার কি নিউজ হলো না হলো তা নিয়ে আসতাম। সারা সপ্তাহে ২ জনের একটিভিটিজ কোথায় কি করল না করল তা আমাকে লিখতে হতো। এত কিছুর পর আমাকে স্টাফ রিপোর্টার করেনি। বিচিত্রায় আজ পর্যন্ত কোন নারী স্টাফ রিপোর্টার হতে পারেনি।

 

এত প্রগতিশীলতার পত্রিকা সেখানে আমার যায়গা হয়নি। আমি কাজ করেছি কিন্তু আমাকে বৈধভাবে স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে না। আমার নাম যাচ্ছে রিপোর্টিং করে। আর আমার রিপোর্টের সঙ্গে আর একজনের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।

আগামীকাল প্রকাশিত হবে সপ্তম ( শেষ) পর্ব