পর্ব – ৭
আমাদের রাস্তাঘাটে মেয়েদের যে যৌন হয়রানি করা হয়, এগুলোর বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য আমরা স্ট্রিট থিয়েটার কর্মসূচি করেছি। ফেরদৌসী মজুমদার, আফরোজা বানু তারা আমাদের কর্মীদের ট্রেনিং দিয়ে সহযোগিতা করেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের অধ্যাপকও ছিলেন। উনারা আমাদের কর্মীদের ট্রেনিং দিতেন। আমরা ট্রাকটাকে স্টেজ করে ২/৩ জন কর্মী নিয়ে নাটক প্রচার করতাম। উপস্থিত লোকজন আসলে আমরা বলতাম যে আপনারা কি মনে করেন এটা কি সঠিক কাজ? তখন তারা বলত যে এটা সঠিক কাজ না। কেউ কেউ প্রতিবাদ করে বলত যে, না আপনারা পুরুষদেরকে বদনাম দিচ্ছেন। পুরুষদের বদনাম করা হচ্ছে। তখন আমরা জানতাম যে কি বদনাম হচ্ছে। পরে বলতাম যে, আপনারা ভাল মানুষ আপনারা এগুলো করেন না।
আর কেউ কি আছেন যাদের মা বোন, ভাবি, বউ মেয়ে এই ধরণের অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়েছে। তখন কিন্তু উঠে অনেকেই বলত যে, হ্যা হয়েছে। তার মানে এই দাঁড়াচ্ছে যে, আপনি ভাল মানুষ। আপনি হয়রানি করেননা। কিন্তু অনেকেই হয়রানি করে। এখন কি বলবেন? – এইভাবে বলে আমরা মানুষকে সচেতন করতাম। কিন্তু ২০০১ এর নির্বাচনের পরে আমরা আর এই কর্মসূচিটা চালাতে পারিনি। বলা হয়েছিল, এত নারী স্বাধীনতার দরকার নেই। আর ৭৫ এর পরে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এসেছে। এটা অন্যরকম। আগে আমরা হুড ফেলে, মাথায় কাপড় না দিয়ে চলাফেরা করলে কেউ কিছু বলত না। ২/১ জন হয়ত তাকাত। বাকিরা চুপ থাকত। বলার সাহস পেতনা। কিন্তু ’৭৫ পরে কিন্তু বলার সুযোগ পেয়েছে। এত নারী স্বাধীনতার দিন শেষ। আমি নিজে আক্রান্ত হয়েছি। এই হুড তুলেন না কেন? এই মাথায় কাপড় দেন না কেন? এই পিঠে কাপড় দেন না কেন? এই ধরণের কথাবার্তা কিন্তু আমাদের শুনতে হয়েছে। আর্মিরা বলেছে। পুলিশরা বলেছে। আমাকে একদিন নৌ বাহিনীর প্রধানের যে বাড়ি ইস্কাটনের সামনে. তার বাড়ির গেটের দারোয়ান সে যখন বলছে, আমি রিকশা থেকে নেমে প্রতিবাদ করেছি। তখন ইয়াং ছিলাম। অনেকেই আমার চেহারা চিনত। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এবং ছাত্রী নেত্রী হিসেবে। আমি তাকে বললাম যে, আমি তোমার অফিসারের সঙ্গে দেখা করব। তোমার অফিসারের বউ মাথায় ঘোমটা দেয় কিনা সেটা জিজ্ঞেস করব। এই ধরণের পরিস্থিতিতে আমরা পড়েছি। এই পরিস্থিতিটাই কিন্তু বাংলাদেশে আমাদেরকে অনেক দূর পিছিয়ে নিয়েছে সাংস্কৃতিকভাবে এবং নারী স্বাধীনতার বিরুদ্ধে।
সাঈদীর ক্যাসেট প্রত্যেকটা বাসে বেজেছে। নারী বিরোধী, নারীর সমান অধিকার বিরোধী যে ওয়াজ-মাহফিল এই ২০ বছরের মতো চলেছে। এইটা তো এখনও চলে। এই যে নারী বিরোধী প্রচারণা, টেলিভিশনে এই যে নারীবিরোধী প্রচারনা, সোশ্যাল মিডিয়াতে নারী বিরোধী প্রচারণা, তারপরে এই তেঁতুল হুজুর উনি যে কথা বলেছেন, এর বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ নেই। শরীয়ত বয়াতী কি বলেছে, তাকে নিয়ে হাজতে পুরেছে। তাহলে শফিকে কেন হাজতে নেয়া হলো না? আমার প্রশ্ন। তাহলে আমরা সমাজে কিভাবে চলব। ৭৫ এর পরে যে পচনটা ধরেছে সেখান থেকে এখনও কেউ বেরিয়ে আসতে পারেনি। খোদ আওয়ামীলীগ অনেক যায়গায় সারেন্ডার করেছে। সুতরাং এইসব কারণে নারী নির্যাতন কমার পরিবর্তে দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে। এটা নারী নির্যাতনকে বৈধতা দিয়েছে। নারী নির্যাতন আগেও ছিল। এটা রাজনৈতিকভাবে এবং সামাজিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে।
এখন যাত্রা হতে পারেনা, ফোক ফেস্টিভ্যাল হতে পারেনা। আমি নেত্রকোনার মেয়ে। আমরা প্রচুর ফোক ফেস্টিভ্যাল করেছি। নারী প্রগতি সংঘের পক্ষ থেকে। সারারাত ধরে মুক্তার পাড়ার মাঠে এগুলো হয়েছে। এই ২০০১ সালের পর থেকে আমরা আর এই ফেস্টিভ্যাল করতে পারিনি। ছায়ানটের মতো প্রতিষ্ঠানকে ২০০১ সালের পর থেকে অনুষ্ঠান করতে দেয়নি। তারপরও তারা বলে যে তারা গণতান্ত্রিক। যে সমস্ত সিভিল সোসাইটির মানবাধিকারের নেতারা তাদের পক্ষে তাদের গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করে, তাদের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা নিয়েও আমি প্রশ্ন তুলি।
◈সমাপ্ত◈

















